বিলুপ্ত প্রায় ঐতিহ্যবাহী জামদানী শাড়ী পুনরুদ্ধারে আল আমীনের বুনন শিল্প

 

কলমাকান্দা থেকে রীনা হায়াৎঃ

নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার রংছাতি ইউনিয়নের বাতানিয়া পাড়া গ্রামের অহেদ আলীর বড় ছেলে মোঃ আল আমীন মিয়া দশ বছর আগে তার পরিবারকে না জানিয়ে হেফজেখানা মাদ্রাসা থেকে ১০ বছর বয়সে পালিয়ে যায় ঢাকা সোনারগাঁও নারায়নগঞ্জ জেলার কাঁচপুর উপজেলার বারোগাও এলাকায়। সেখানে আসলাম মিয়া নামে এক লোকের জামদানী শাড়ী বুনন শিল্প কারখানায় কাজ নেন। দীর্ঘ দশ বছর সেখানে তাঁত শিল্পের কাজ শিখে বাড়ি ফিরে আসেন। বাড়িতে এসে বাবার কৃষি কাজে মন দেন। টানা তিন বছর কৃষিকাজ করে তার আর কৃষি কাজে মন বসাতে পারছেনা। কিন্তু কি করবে সে; কিচ্ছু ভেবে উঠতে পারছেনা। এদিকে পরিবারের লোকজন তার প্রতি খুব বিরক্ত। পড়াশুনাও করলো না, কৃষি কাজেও মন বসাতে পারছেনা, কি করে জীবন কাটাবে সে। এই অবস্থার মধ্যদিয়ে আল আমীন দিশেহারা প্রায়! হঠাৎ তার মাথায় আসে, জামদানী শাড়ী বুননের শিল্প কাজ জানা আছে তার, বিলুপ্ত প্রায় এই শিল্পটাকে পুনরুদ্ধারে কাজ করবে। এই পাহাড়ি প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমার মত কত বেকার কর্মহীন তরুন তরুণী যুবকেরা আছে, তাদের কথা চিন্তা করে তার নিজের বাড়িতেই একটি জামদানী শাড়ী তৈরির উদ্যোগ নিলে পরিবার তার কাট দিয়ে তৈরী মেশিনটি ভেঙে ফেলে। এতে আল আমীন হাল ছাড়েনি, পুনরায় আরেকটি কাটের মেশিন তৈরি করে আবার সেই ঐতিহ্যবাহী জামদানী শাড়ী বুনতে থাকে। এভাবে ধীরে ধীরে সে এগোতে থাকে। কয়েকমাসে তিনটি শাড়ী বুনে ফেলে সে। বুনন এই তিনটি শাড়ী নারায়ণগঞ্জ শহরে পাঠিয়ে দেন। দেখা গেল, প্রতিটি শাড়ী ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা ধরে বিক্রি হল। আল আমীন আশার আলো দেখতে লাগলো। পরবর্তীতে এই শাড়ী বিক্রির টাকা দিয়ে আরও চারটা কাটের মেশিন সুঁতো প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে আরও ৮ জন তরুণ যুবককে সঙ্গে নিয়ে তার এই বুনন শিল্পীকে এগিয়ে নিতে যাত্রা শুরু করল।
এই জামদানী শাড়ী বুনন শিল্পী আল আমীন জানান, আমার এখানে যারা কাজ করছে তাদের প্রত্যেকের মাসিক বেতন ১৫ হাজার টাকা। তবে প্রডাক্টশনে যারা কাজ করে তারা ২০ হাজার টাকা মাসিক আয় করে। এই বুনন শিল্পী আরও জানায়, বর্তমানে জামদানীর শাড়ীর কদর বেড়েছে। ভবিষ্যতে আমার এই কারখানাটি আরও বড় আকারে প্রসারিত করে এলাকার বেকার কর্মহীন যুবক যুবতীদের স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান তৈরি করে দিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে আছে। এই জামদানী শাড়ীর সুঁতো ঢাকা থেকে সংগ্রহ করতে হয়। একটি শাড়ী ১২ হাত লম্বা তৈরি করতে কমপক্ষে এক মাস সময় লেগে যায় আমাদের।
এই শিল্পকর্মে জড়িত তরুণ যুবকেরা আসলাম, মুমিনুল, সোহাগ, শাহীন, মোস্তাকিম ও শামীম মিয়া জানান,
হারিয়ে যাওয়া বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিল্প ফিরিয়ে আনতে এই জামদানী তাঁতের শাড়ী তৈরিতে আমাদের পারিশ্রমিক বাদ দিয়ে প্রতি শাড়ীতে ৫০ হাজার টাকা ধরে বিক্রি হলেও দেখা যায়, যেভাবে দ্রব্যমুল্যের উদ্ধর্গতি সে হারে আমাদের কাজের পারিশ্রমিক মজুরি পাচ্ছিনা, তবে আশা রাখি হয়তো আমরা আমাদের এই জামদানী শাড়ীর শিল্পকর্মকে একদিন এগিয়ে নিয়ে যাবো বিশ্বের দরবারে, সেদিনে আশানুরূপ মজুরি বৃদ্ধি পাবো বলে প্রত্যাশা রাখি।
শুক্রবার (১১ মে) বিকেলে ওই সীমান্ত এলাকায় ঘুরতে গিয়ে তারই বুনন শিল্পকর্মটি চোখে পড়ে এবং এই শিল্পের সূচনা কিভাবে সৃষ্টি হয় আল আমীন নিজেই জানায়।
আল আমীনের এই শিল্পকর্মকে সীমান্তেরই প্রত্যন্ত অঞ্চলের এলাকাবাসী এখন সাধুবাদ জানায়। যে পরিবার এক সময় তার এই শিল্প কর্মকে ভেঙে দিয়েছিল এখন তারাই ছেলের এই কর্ম দেখে গর্ববোধ করেন এবং পরিবারের ছোট ভাইয়েরাও এই বুনন শিল্পের কাজ করে আয় উপার্জন করে যাচ্ছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Share & Like
Share & Like